ভেবেছিলাম, এখান থেকেই চলে যাবো আমার ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার কাহিনীতে। কিন্তু না, আমাদের ক্লাসের আরেকজন ছাত্রের ব্যাপারে কিছুই না বলে চলে যাওয়াতে মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। আর সেটা আরও প্রবল হলো ক্যাডেট কলেজ ব্লগে ‘জীবনের জার্নাল – ২’ পড়ে করা এক পাঠকের মন্তব্যে। কি করে যে সে বুঝতে পারলো আমার মনের কথাটা কে জানে। সে লিখেছে, “আপনাদের ক্লাসের সবচেয়ে অবহেলিত ছেলেটির কথা জানতে চাই।”

আমিও তার কথাটা একটু বলতে চেয়েছিলাম। সে ছিলো যেমন সবচেয়ে অবহেলিত, তেমনি সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভা। যে ক’টা বছর ঐ স্কুলে ছিলাম, দুই সেকশন মিলে তাকে বরাবরই প্রথম হতে দেখেছি। শিক্ষকগণ যেমনি তাকে ভালোবাসতেন, আমরাও তেমনি। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্ট ছেলেরাও কোনদিন তার সাথে দুষ্টামি করতোনা। তার প্রথম নামটাই শুধু আজ মনে আছে- শহীদ। মোটা পুরু ফ্রেমের সস্তা চশমা পড়তো। প্যান্ট শার্টে তালি রিপু থাকলেও তা পরিস্কার থাকতো। মুখে লেগে থাকতো বিনম্র হাসি। অত্যন্ত নম্র ভদ্র ছেলে। কখনো খেলার মাঠে যেত না। ক্লাস শেষে তড়িঘড়ি করে বাড়ী দৌড়াতো। প্রথমে বুঝতে পারিনি, তাই কারণ জিজ্ঞেস করতাম। জবাবে পেতাম শুধুই তার একটা বিনম্র হাসি। পরে ফাহিয়ানের কাছে জেনেছিলাম, বাড়ীতে তার সৎ মা ছিলো। তাকে স্কুলে পড়তে শুধু এই শর্তে অনুমতি দেয়া হয়েছিলো যে সে স্কুলে যাবার আগে পরে বাড়ীর ধোয়া পাকলা, সাফ সুতরোর মত ডমেস্টিক কাজগুলো করবে। মোটকথা, বাসার সবার কাপড় কাচা, থালা বাসন ধোয়া, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, বাজার করা ইত্যাদি ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। এর মাঝে যেটুকু সময় সে পেতো, সেটুকুই অধ্যয়নের কাজে ব্যবহার করে ক্লাসে প্রথম হতো। তবে একটু উপরের ক্লাসে উঠে সে তার এই স্থানটা আর ধরে রাখতে পারেনি। শুনেছিলাম, মেট্রিক পরীক্ষায় সে শুধু সাধারণ একটা ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে স্বাধীনতার ঠিক আগে আগে স্টেট ব্যাঙ্ক অব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক) একটা নিম্ন পদের চাকুরীতে যোগ দিয়েছিলো। নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে সে কোথায় যে হারিয়ে গেলো, তার খোঁজ আর কেউ রাখেনি। আসলে তার কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলনা, যাকে জিজ্ঞেস করে কিছু জানতে পারতাম। ওর পরিস্থিতিতে কারো সাথে বন্ধুত্ব রাখাটাও বড় কঠিন বিলাসিতা ছিলো, তা আজ বেশ সহজেই বুঝি।

স্মৃতি আজকাল বড়ই প্রতারণা করে। তাই ভুলে যাবার আগে আমি এই পর্যায়ে কিছু ভালোলাগা বন্ধুদের নামোল্লেখ করতে চাই এই আশায়, যে হয়তো পরিচিত কারো নজরে লেখাটা পড়ে গেলে তাদের সাথে একটা যোগসূত্রের সম্ভাবনা দেখা দিলেও দিতে পারে। ইগ্নিশিয়াস গোমেজ ওরফে বিজু নামে আমার একজন ভালো বন্ধু ছিলো। নামেই বোঝা যায়, সে খৃষ্টান ছিলো। নিবাস কর আর সুবাস কর নামে দুই ভাই ছিলো। ওরা হিন্দু ছিলো। পূজো পার্বনে বাতাসার ভাগ পেতাম। ওদের বড় বোন দীপালী কর আমার বোনেরও বান্ধবী ছিলেন। মহীউদ্দীন আব্দুল কাদের নামে আমাদের চেয়ে বয়সে বড় একজন নামাযী ছেলে ছিলো, খুবই ভদ্র। রেজাউল করিম নামে একজন চঞ্চল প্রকৃ্তির বন্ধু ছিলো। আর ইকবাল নামে আরেক বন্ধু ছিলো, যার সাথে পরে যোগাযোগ হয়েছিলো তার ছোটভাই ইসতিয়াক এর মাধ্যমে। তার বড় বোন লাইলীও আমার বড় বোনের বান্ধবী ছিলেন।

এখন ফিরে আসছি আবার ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার কথায়। ফরম পূরনের পর থেকে মূলতঃ আব্বার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই আমার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হলো। আব্বা অঙ্ক আর ইংরেজীটা খুব ভালো পড়াতেন। অঙ্ক এমন করে বুঝাতেন যে একবারেই বুঝে যেতাম। ইংরেজী ট্র্যান্সলেশনের উপর খুব জোর দিতেন। ওটা করতে গিয়েই স্টক অব ওয়ার্ডস বেড়ে যেত। বাসায় ইংরেজী পেপার রাখা হতো রেগুলার। সেখানেও ইংরেজী চর্চার উপকরণ পাওয়া যেতো। তখনকার দিনে “গেট এ ওয়ার্ড” নামে পেপারে একটা সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা হতো। সেখান থেকেও নতুন নতুন কঠিন ইংরেজী শব্দের সাথে পরিচিত হওয়া যেতো, তবে কাঠিন্যের কারণে ওটা আমার ততটা কাজে দেয়নি এবং আমিও মোটেই উৎসাহী ছিলাম না। আব্বার দেখিয়ে দেয়া টেকনিক ধরেই আমি অনুবাদ করতাম এবং ক্লাসে সবসময় অনুবাদের জন্য সর্বোচ্চ নম্বরটা আমারই জন্য বরাদ্দ থাকতো। বড় হয়ে একদিন আব্বাকে লেখা (তখনকার দিনের দুই পয়সার) পোস্ট কার্ডে আমার দাদার ইংরেজীতে লেখা একটা চিঠি পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম, আব্বার ইংরেজী শেখাটাও আমার দাদার কল্যানেই হয়েছিলো। অথচ আমার দাদার শিক্ষাগত ডিগ্রী খুব বেশী ছিলনা। তিনি দেওবন্দে আরবী ও ধর্মশিক্ষায় শিক্ষাগ্রহণ করে নীলফামারী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে আরবীর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং অবসর গ্রহনের পর আমাদের বাড়ীর কাছের মাসজিদে আজীবন ইমামতি করেছেন। তিনি আমার জন্মের আগেই প্রয়াত হন, সে কারণে তাঁকে চোখে না দেখলেও তার একটা ইমেজ আমার মনে গেঁথে আছে। তিনি আরবী ও ফারসী ভাষায় একজন বিজ্ঞ ও পারদর্শী ব্যক্তি হিসেবে দূরদূরান্তে বেশ সুপরিচিত ছিলেন বলে লোকমুখে শুনেছি।

একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দেখি সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে কিছু একটা আলাপ করছে। বুঝতে পারলাম, আমার ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু হবে। আব্বার হাতে একটা লম্বা খোলা হলুদ খাম ধরা। আমাকে দিলেন। খামের উপরটা মনোনিবেশ সহকারে পড়লাম। আমাদের বাসার ঠিকানা লেখা, উপরে একটা সীলমোহরে “MOMESHAHI CADET COLLEGE” কথাটা গোল করে লেখা। মোমেনশাহী নামটা শুনতে আমার খুব ভাল লাগতো, এর ইতিহাস কিছুটা জানা ছিলো বলে। লক্ষ্য করেছিলাম, সীলে ইংরেজী N অক্ষরটা মিসিং ছিলো। অনেকদিন ঐ সীলটা ওভাবেই ব্যবহৃত হয়েছিলো। বোধকরি, স্বাধীনতার পরে সব সীল বাংলায় পরিবর্তনের আগে পর্যন্ত ওটা ওভাবেই ছিলো। খাম খুলে দেখি সেখানে আমার ছবি সম্বলিত একটা এডমিট কার্ড। ভেতরে ভেতরে একটা আশঙ্কা এবং সেই সাথে চ্যালেঞ্জের অনুভূতি স্পর্শ করে গেলো।

চলবে…

একটি অনুরোধঃ স্মৃতির সম্ভার থেকে হাতড়িয়ে ৪৮ বছরের পুরনো আলোচনায় কিছু তথ্যগত ভুল থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। তাই, এমিসিসি’র ছোট বড় ভাইদের এবং আমার সতীর্থদের কাছে অনুরোধ থাকলো, আমার লেখায় যদি আপনারা কোন তথ্যগত ভুলভ্রান্তি কিংবা অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করেন, তবে দয়া করে আমাকে khairulahsan@yahoo.com এই ঠিকানায় জানালে বিশেষ উপকৃত হবো এবং কৃ্তজ্ঞ থাকবো।
ঢাকা
০৭ জুলাই ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

1 Comment
  1. Dear Khairul,

    This is my first visit to this site today. After reading a few of your journals (in no particular order), and specially on your mentioning Fahian’s name, I was closing in on you as the writer. Then I saw your email address.

    Not only do you write extremely well (naturally, you are a poet), you have an excellent memory too. Its a pleasure going over the memories of a contemporary.

    Look forward to reading more of your journal.

    Warm regards,

    Taufiq

Leave a reply

©[2015-2019] Mirzapur Ex-Cadets' Association Developed By Esoftarena Limited

CONTACT US

We're not around right now. But you can send us an email and we'll get back to you, asap.

Sending

Log in with your credentials

Forgot your details?